Interview

সেলফোন সেবা ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা ইকবাল কাদীর

দেশে সেলফোন সেবার সূচনা আশির দশকের শেষ ভাগে। গোটা উপমহাদেশেই এ সেবা প্রথম চালু হয় বাংলাদেশেই। যদিও পরের প্রায় এক দশকে শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে সেলফোনের ব্যবহার। ব্যয়বহুল হ্যান্ডসেট ও উচ্চ কলরেটের কারণে সেবাটি ছিল অন্যদের আয়ত্তের বাইরে। কর্তৃত্ব ছিল শুধু একটি অপারেটরের। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ১৯৯৬ সালে। ওই সময়কার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নতুন তিন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়। এর ধারাবাহিকতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সেলফোন সেবাকে ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে সূত্রধরের ভূমিকায় ছিলেন ইকবাল কাদীর, যিনি বর্তমান শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও উদ্যোক্তা।

যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ব্যাংকার হিসেবে কাজ করা ইকবাল কাদীর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেলফোনের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে ভেবেছিলেন। সে চিন্তা থেকেই এমন একটি সেলফোন অপারেটরের সেবা চালুর উদ্যোগ নেন, যেটি সুলভে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। এ নিয়ে সে সময় গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এরপর বিনিয়োগকারী খোঁজার পালা। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে বলে টেলিনরকে বোঝাতে সক্ষম হন ইকবাল কাদীর। এশিয়ায় টেলিনরের প্রথম বিনিয়োগ গ্রামীণফোনেই। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশেও বিনিয়োগ করে টেলিনর।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, একটি মাত্র অপারেটর সিটিসেল দিয়ে দেশে সেলফোনের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় হ্যান্ডসেটের দাম ছিল সোয়া লাখ টাকা। আউটগোয়িং কলরেট ১৪ টাকা আর ইনকামিং কলরেট ছিল ১২ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের পক্ষে এ সেবা নেয়া সম্ভব ছিল না। শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়া হয়। দেশে সেলফোন সেবা খাতের বিকাশের শুরুটা মূলত তখন থেকেই।

তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের উদ্যোগের পেছনে ইকবাল কাদীরের ভূমিকা ছিল। মূল ভাবনাটাই ছিল তার। মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেবে এমন একটা সেলফোন অপারেটরের বিষয়ে ভেবেছিলেন তিনি। এরপর সেটির জন্য বিনিয়োগ জোগাড়েও কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সেবা চালুর পর বেরিয়ে যান তিনি।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সরকার নতুন লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নিলে দরপত্র জমা দেয় টেলিকম মালয়েশিয়া (একটেল), সেবা টেলিকম, টেলেস্ট্রা ও গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটি এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। ১৯৯৬ সালে অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়ামকেও লাইসেন্স দেয় তত্কালীন সরকার। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ দেশের প্রথম অপারেটর হিসেবে জিএসএম (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন) প্রযুক্তির সেলফোন সেবা চালু করে গ্রামীণফোন।

তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠন করা হয় গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম—টেলিনর, গ্রামীণ টেলিকম ও গণফোন। লাইসেন্স পাওয়ার সময় গ্রামীণফোনে টেলিনরের শেয়ার ছিল ৫১ শতাংশ। বাকি শেয়ারের মধ্যে গ্রামীণ টেলিকমের ছিল ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ ও গণফোনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে গ্রামীণফোনে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার রয়েছে ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বাকি ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ গ্রামীণ টেলিকম ও ১০ শতাংশ সাধারণ শেয়ার।

টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞ ও লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাইদ খান বলেন, বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে সে সময়কার সংকটটা বুঝতে পেরেছিলেন ইকবাল কাদীর। তার সবচেয়ে বড় অর্জন টেলিনর ও ড. ইউনূসের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা। এশিয়ায় এটিই ছিল টেলিনরের প্রথম উদ্যোগ। কঠিন এ কাজ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জনের বিষয়টি টেলিনরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন ইকবাল কাদীর।

ব্যবসার শুরুর দিকটা মোটেও সহজ ছিল না গ্রামীণফোনের। মানুষের কাছে সেলফোন সেবা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা ছিল এ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা। ফলে গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তি তৈরিতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছে প্রতিষ্ঠানটির। ২০০৬ সালে এক কোটি গ্রাহকসংখ্যার মাইলফলক ছুঁয়েছে গ্রামীণফোন। একমাত্র অপারেটর হিসেবে এখন পর্যন্ত ছয় ও সাত কোটি গ্রাহকের মাইলফলক ছুুঁয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দুই দশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে বেশকিছু ভূমিকাও রয়েছে গ্রামীণফোনের। দেশের প্রথম সেলফোন অপারেটর হিসেবে সারা দেশে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছে গ্রামীণফোন।

তবে প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মাথায় ২০০০ সালেই গ্রামীণফোন মুনাফা করতে শুরু করে। মূলত স্ক্যান্ডিনেভিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ায় বিনিয়োগ করেছে টেলিনর। এর মধ্যে ইউরোপে প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি রয়েছে নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো ও বুলগেরিয়ায়। আর এশিয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় টেলিনরের বিনিয়োগ রয়েছে। আর ভারতে ২০১৮ সালে কার্যক্রম বন্ধ করে তারা। টেলিনরের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যাই সর্বোচ্চ।

ইকবাল কাদীর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) লেগাটাম সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও ইমেরিটাস পরিচালক। বর্তমানে হার্ভার্ডের অ্যাশ সেন্টারে সিনিয়র ফেলো হিসেবে কাজ করছেন তিনি। বাংলাদেশে সেলফোন সেবা ছড়িয়ে দিতে গ্রামীণফোন গঠনের পেছনে তার উদ্যোগ বিশ্বেই অনন্য। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশেও এমন উদ্যোগ দেখা গেছে। এর স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। তাকে ‘গ্লোবাল লিডার ফর টুমরো’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। নরওয়ের অন্যতম শীর্ষ গণমাধ্যম ডিএন তাকে আখ্যা দিয়েছে ‘দ্য ডোর ওপেনার টু এশিয়া’ হিসেবে।

এমন উদ্যোগের পেছনে কোন ভাবনা কাজ করেছে, জানতে চাইলে ইকবাল কাদীর বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থসহায়তা দেয়। তবে অর্থসহায়তার চেয়ে এসব দেশের প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার আরো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়নেও প্রয়োজন উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অর্থসহায়তা নয়। গ্রামীণফোনের মাধ্যমে এটি প্রমাণ হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সেলফোন সেবা চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল কারিগরি জ্ঞান। যদিও কিছু বিনিয়োগ দিয়ে গ্রামীণফোন শুরু হয়, অধিকাংশ বিনিয়োগ এসেছে সাধারণ মানুষের সেলফোন ব্যবহার থেকে অর্জিত টাকা দিয়ে।

তিনি বলেন, এ দেশে টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করতে বিভিন্ন দেশের অপারেটরের সঙ্গে সে সময় আলোচনা করতে হয়েছে। তবে বাংলাদেশের নাম শুনে অনেকেই আগ্রহী হয়নি। শেষ পর্যন্ত নরওয়ের টেলিনর প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে রাজি হয়। পরবর্তী সময়ে আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করেছে। তবে বিনিয়োগের বড় অংশটিই এসেছে জনগণের কাছ থেকে, সেলফোন ব্যবহারের মাধ্যমে।

দেশে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রথম দিককার অন্যতম পেশাজীবী মাহমুদ হোসেন। সিটিসেলের শুরুর সময়ের এ প্রকৌশলী পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন গ্রামীণফোনেও ছিলেন। তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের গোড়াপত্তনের আগেই এ নিয়ে কাজ করেছেন ইকবাল কাদীর। তার হাত ধরেই দেশে জিএসএম প্রযুক্তির সেলফোন সেবা চালু হয়।

চালুর পর তিন বছরের মতো গ্রামীণফোনে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ইকবাল কাদীর। এরপর প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যান তিনি। ইকবাল কাদীর বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে নতুন উদ্যোগের সঙ্গে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, নানা ধরনের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে আগ্রহী। সুযোগ পেলে আগামীতে বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও গবেষণানির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে। এটি হতে পারে বাংলাদেশে এমআইটির মতো কোনো প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর শেষে সেলফোন অপারেটরদের সংযোগসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের সংযোগ ৭ কোটি ৯০ লাখ, রবি আজিয়াটার ৫ কোটি ৯ লাখ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৫২ লাখ ও টেলিটকের ৪৯ লাখ ২৭ হাজার সংযোগ রয়েছে। এ সময় ১১ কোটি ১৮ লাখ ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যে সেলফোন অপারেটরদের ইন্টারনেট সেবার আওতায়ই রয়েছে ১০ কোটি ২৩ লাখ।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ১৩ মার্চ, ২০২১ | নিউজ লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker