ব্যবসায়িক পারদর্শিতা হারাচ্ছে গ্রামীণফোন

ব্র্যান্ড ভ্যালুতে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন । যদিও কয়েক বছর ধরেই সেলফোন অপারেটরটির আয় তথা বিক্রয় প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। গত তিন বছরে তাদের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশের নিচে। সম্পদ খুব বেশি না বাড়লেও বাড়ছে দায়। মুনাফার অংশ পুনর্বিনিয়োগ না করে লভ্যাংশ আকারে তা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বাড়াতে হচ্ছে ব্যাংকঋণ। ইকুইটি কমায় ও ঋণ বাড়ায় ক্রমেই খারাপ হচ্ছে ঋণ-ইকুইটি অনুপাত। রয়েছে গ্রাহক অসন্তুষ্টিও। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) সবচেয়ে বেশি গ্রাহক অভিযোগ জমা পড়ছে তাদের বিরুদ্ধেই। সব মিলিয়ে পারদর্শিতা হারিয়ে আর্থিক সূচকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে সেলফোন অপারেটরটির।
আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা পরিমাপে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচক রয়েছে। আয় প্রবৃদ্ধি, চলতি অনুপাত, ঋণ-ইকুইটি অনুপাত, ক্যাশ কনভারসন সাইকেল (উৎপাদিত পণ্য নগদায়ন করার সময়সীমা), দায় ও সম্পদের অনুপাত এর মধ্যে অন্যতম। এসব সূচক দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষতা হারাচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ক্রেডিট রেটিং রিপোর্ট ও আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকেই গ্রামীণফোনের আয় প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। পরের বছর তা ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এর পরই আয় প্রবৃদ্ধিতে ধস নামে। পর পর তিন বছর এক অঙ্কের প্রবৃদ্ধি করে গ্রামীণফোন। গত বছর ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
অপারেটরটির চলতি অনুপাতও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চলতি সম্পদ দিয়ে চলতি দায় কতটুকু পরিশোধ করা যায়, সেটাই চলতি অনুপাত। বর্তমানে গ্রামীণফোনের চলতি সম্পদ রয়েছে ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ও চলতি দায় ৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির চলতি অনুপাত দশমিক ২৪। এর অর্থ চলতি সম্পদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি চলতি ঋণের মাত্র ২৪ শতাংশ পরিশোধ করতে পারবে। যদিও পাঁচ বছর আগে ২০১০ সালে এ অনুপাত ছিল দশমিক ৭৩।
গ্রামীণফোনের দ্রুত (কুইক) অনুপাতও কমছে। গত বছর এ অনুপাত দাঁড়ায় দশমিক ২২-এ; ২০১০ সালে যা ছিল দশমিক ৬৭। এক্ষেত্রে চলতি সম্পদ থেকে মজুদ (ইনভেন্টরি) বাদ দেয়া হয়। টেলিকম খাতে সাধারণত সিম কার্ড, রিচার্জ কার্ডই ইনভেন্টরি হিসেবে বিবেচ্য।
এ ধরনের পরিস্থিতি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতায় ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি মুসীহ মালিক চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হলে ইকুইটি-ঋণ অনুপাত বাড়াটা স্বাভাবিক। ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করলে আয় বাড়ার কথা। তবে আয় প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ না হলে ও সঞ্চিতি না রাখলে তা সম্পদের ওপর ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি অনুপাতের মান ১ হলে চলতি সম্পদ ও চলতি দায় সমান থাকে, যা মোটামুটি আদর্শ। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে টেলিকম খাতের চলতি অনুপাতের আদর্শ মান ১ দশমিক ২১। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ কোম্পানির চলতি অনুপাত বর্তমানে দশমিক ৯৮ থেকে ১ দশমিক ৪-এর মধ্যে। তবে গ্রামীণফোনের বর্তমান চলতি অনুপাত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ঋণের বড় অংশ পরিশোধ করতে প্রতিষ্ঠানটিকে আবার ঋণ নিতে হবে।
এদিকে কয়েক বছর ধরে গ্রামীণফোনের দায় বাড়ছে। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় ছিল ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। ২০১৪ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়। যদিও গত পাঁচ বছরে গ্রামীণফোনের সম্পদ প্রবৃদ্ধি হয়েছে অনেক কম। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। ২০১৪ সাল শেষে তা দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকায়।
সম্পদ খুব বেশি না বাড়ায় ও দায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটি কমছে। ২০১০ সালে গ্রামীণফোনের ইকুইটি ছিল ৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। অথচ গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির ঋণকৃত তহবিল বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০১০ সালে এ তহবিলের পরিমাণ ১ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা হলেও ২০১৪ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন্স সৈয়দ তালাত কামাল বলেন, ‘কোম্পানির আকার, ম্যাচিউরিটি ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী চলতি অনুপাত ও ব্যবসায়িক ফলাফল যথেষ্ট ভালো।’
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নিলামে থ্রিজির তরঙ্গ বরাদ্দ পায় গ্রামীণফোন। একই বছরের ৭ অক্টোবর গ্রামীণফোন বাণিজ্যিকভাবে এ সেবা চালু করে। লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দ বাবদ ১০ মেগাহার্টজের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এছাড়া এ সময়ে বিদ্যমান টুজি নেটওয়ার্ক উন্নয়নেও বিনিয়োগ করেছে গ্রামীণফোন। অথচ সে অনুপাতে গ্রাহক বা ডাটাভিত্তিক সেবার প্রবৃদ্ধি হয়নি।
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির ডাটাভিত্তিক সেবা থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০১৩ সালের শেষ দিকে থ্রিজি সেবা চালুর পরও এ খাতে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য নয়। চলতি বছরের মে মাস শেষে প্রতিষ্ঠানটির থ্রিজি সেবার গ্রাহক ৮৬ লাখ ছাড়িয়েছে। যদিও গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহক ৫ কোটি ৩১ লাখ ২৯ হাজার।
গ্রাহক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণফোনের বাজার দক্ষতাও কমছে। ফলে বিক্রীত পণ্যের মূল্য পেতে বিলম্ব হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ করা পণ্য নগদে রূপান্তরে প্রতিষ্ঠানটির ২০১০ সালে সময় লাগত ১৩৯ দিন। বর্তমানে তা ৪৫২ দিনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ক্যাশ কনভারসন সাইকেলে প্রায় তিন গুণ সময় লাগছে। আর গড় কালেকশন পিরিয়ড ২০১০ সালে ছিল ২৬ দিন। বর্তমানে সময় লাগছে ৫৫ দিন। এতে প্রতিষ্ঠানটির তারল্য সূচক ৫৩ দিনে নেমে গেছে; ২০১০ সালে যা ছিল ২৪ দিন।
এ বিষয়ে আর্থিক খাত বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুবর্ণ বড়ুয়া বলেন, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনায় সার্বিকভাবে চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা প্রমাণ করে। এর সঙ্গে অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ও বিভিন্ন অনুপাত দুর্বল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছে বলা যায়। পাশাপাশি ঋণকে সম্ভবত পুরোপুরি সম্পদে পরিণত করতে পারেনি তারা। এ কারণে দেনার বিপরীতে সম্পদের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হচ্ছে। ফলস্বরূপ আর্থিক ভিত্তির দুর্বল দিক উঠে এসেছে।
এদিকে সেবা নিয়ে অসন্তুষ্টিও গ্রামীণফোন গ্রাহকদেরই বেশি। বিটিআরসির তথ্যমতে, গত বছর সেলফোন, ফিক্সড ফোন ও ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের বিভিন্ন সেবা নিয়ে গ্রাহকরা দেড় হাজারের বেশি অভিযোগ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল গ্রামীণফোন গ্রাহকদের। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সেবা নিয়ে বিটিআরসির কাছে ৭০০-এর বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক বিছিন্নতা, নিম্নমানের ভয়েস সেবা, কল ড্রপ, এসএমএস আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেয়া। আর সম্প্রতি সফটওয়্যারের উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পোস্টপেইড গ্রাহকদের সব ধরনের এবং প্রিপেইডের ডাটাভিত্তিক সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
(যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন ইসমাইল আলী ও সুমন আফসার)
বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ১২ আগস্ট, ২০১৫ | নিউজ লিংক | নিউজ লিংক



