Business

দেশে শিল্প ও বিদ্যুতের মেরুদণ্ড হিসেবে ভূমিকা রেখেছে তিতাস

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে তিতাস নদী। এ নদীর উপকূলেই আবিষ্কার হয়েছিল এ ভূখণ্ডের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র। ১৯৬২ সালে গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে বহুজাতিক কোম্পানি শেল। এর দুই বছর পর শুরু হয় গ্যাস উত্তোলন। এ গ্যাস বিতরণের জন্য গঠন করা হয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল)। তবে তখনো আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলনির্ভরতাই ছিল বেশি। প্রাকৃতিক গ্যাস ছিল অনেকটাই ব্রাত্য। পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের সূচনা ষাটের দশকের শেষ দিকে। সে সময় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে সব দেশ খুঁজতে থাকে বিকল্প জ্বালানি। প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় পূর্ববঙ্গেও।

তিতাসের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু ১৯৬৮ সালে। সে সময় তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস সরবরাহের জন্য তৈরি করা হয়েছিল ৫৮ মাইল দীর্ঘ একটি সঞ্চালন লাইন। এ লাইন ব্যবহার করে সিদ্ধিরগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে তিতাস। সেটিই ছিল এখানকার শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে তিতাসের প্রথম অংশগ্রহণ।

স্বাধীনতার পর দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রেও চালকের আসনে উঠে আসে তিতাস। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিতাসের জ্বালানি শক্তিতে নির্ভর করেই এগিয়েছে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত। খাত দুটির ক্রমবিকাশে রীতিমতো মেরুদণ্ডের ভূমিকা রেখেছে তিতাস।

তিতাসের প্রতিষ্ঠা মূলত বিতরণ কোম্পানি হিসেবে। স্বাধীনতার পরও এক্ষেত্রে অনেকটাই একক ভূমিকা রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। একক অবদান রেখেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঞ্চালন ব্যবস্থায়ও। পাঁচ দশক ধরে দেশের শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে তিতাস। গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকেও শীর্ষস্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটি।

স্বাধীনতার পর দেশের জ্বালানি খাতে প্রথম প্রতিষ্ঠা হয় স্থানীয় কর্তৃত্ব। এর নেপথ্যে ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

ওই সময় জ্বালানি তেল আমদানি দেশের রাজস্ব খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। আমদানি ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই চলে যেত জ্বালানি তেলের পেছনে। এ অবস্থায় ১৯৭৩ সালে গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহ দেয়া শুরু করে সরকার। এরপর ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট বিদেশী কোম্পানি শেল অয়েলের কাছ থেকে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র (তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ও বাখরাবাদ) কিনে নেয়া হয়। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। সেটিই ছিল জ্বালানি নিরাপত্তার পথে বাংলাদেশের যাত্রারম্ভ।

ওই সময়ের পর ধীরে ধীরে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার্য প্রধান জ্বালানি পণ্য হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক গ্যাস। খাত দুটিতে জ্বালানি পণ্যটির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করেছে তিতাস। শিল্প ও বিদ্যুতের অগ্রযাত্রায় তিতাসের অবদানকেও তাই অনস্বীকার্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম তামিম বলেন, দেশের শিল্প-কারখানার উন্নয়নে গ্যাসের ব্যবহারে তিতাস এখানে বড় একটি ভূমিকা পালন করেছে, আজও করছে। বিতরণ ও সঞ্চালনকাজেও তিতাস অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম স্টিল মিলে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করেছিল তিতাস। তখনো জিটিসিএল হয়নি। তিতাসের আওতায় দেশের সরবরাহ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হলো। পরবর্তী সময়ে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তিতাসের অবদান রয়েছে। এখনো সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় তিতাসের।

বর্তমানে দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক। দেশের বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই পোশাক খাতের। দেশে শিল্পটির বিকাশেও অবদান রেখেছে তিতাস। সুলভে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে পোশাক শিল্পকে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল সংস্থাটি। বর্তমানে দেশের ভারী ও মাঝারি শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপটিভ পাওয়ারের ৯০ শতাংশই ব্যবহার করে পোশাক খাত।

বাকি ১০ শতাংশ ইস্পাত শিল্প। উভয় শিল্পের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমে জ্বালানি হিসেবেও মূলত তিতাসের সরবরাহকৃত গ্যাসই ব্যবহার হচ্ছে।

পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করছেন, দেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের উন্নয়নে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছে সুলভে গ্যাস সরবরাহ। গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলোকে কাজে লাগিয়ে বিকাশ হয়েছে খাতটির। শুরুতে এ খাতে প্রতি কিউবিট ঘনমিটারে গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ৩-৪ টাকায়। এখনো তা পাওয়া যাচ্ছে ৮-৯ টাকাতেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মাদ আলী খোকন বলেন, বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পে ক্যাপটিভ পাওয়ারের অবদান অনবদ্য। দেশে গ্যাস না থাকলে এত দ্রুত উন্নয়ন ঘটত না। গ্যাস সংযোগের কারণে ক্যাপটিভ পাওয়ার চালিয়ে গার্মেন্টস শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া গিয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারের কারণে দেশে বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পগুলোর দ্রুত বিকাশ হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামের মতে, খনিজ সম্পদের ব্যবহার বাড়িয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যে পরিমাণ শিল্পায়ন করেছে তা বিগত ২০ বছরেও হয়নি। শুরুতেই এর নেপথ্যের ভূমিকা রেখেছে কম মূল্যের গ্যাস। সে সময় তিতাসের সাহসী ভূমিকা থাকার কারণে বাংলাদেশের শিল্প-কলকারখানা এ অবস্থায় এসেছে।

তিনি বলেন, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও গ্যাসের চেয়ে অন্য কোনো জ্বালানিতে খরচ কম নয়।

বর্তমানে শিল্প, বিদ্যুৎ, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সার কারখানা, সিএনজি, বাণিজ্যিক ও আবাসিক মিলিয়ে তিতাসের মোট গ্রাহক সংখ্যা ২৮ লাখের বেশি। ছয় বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাসেরই গ্রাহক সবচেয়ে বেশি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির বর্তমানে অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা। গত ৫০ বছরে গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অটোমেশন, গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন ও গ্যাসকূপের আধুনিকায়ন কার্যক্রমও পরিচালনা করেছে তিতাস।

তিতাসের অগ্রযাত্রায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও জ্বালানি সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বড় একটি অংশে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে তিতাস। শিল্পায়ন ও কম মূল্যের উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের যে ভূমিকা, তার অন্যতম দাবিদার তিতাস। তিতাসের সাহসী পদক্ষেপের কারণেই আজ জ্বালানি খাতে অনেকগুলো কোম্পানি তৈরি হয়েছে, যারা গ্রাহকসেবা দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

(যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সুমন আফসার ও আবু তাহের)

বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ২১ মার্চ, ২০২১ | নিউজ লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker