HealthLife Style
Trending

চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিটি করিডোরে রাখা কালো রঙের ডাস্টবিন। হলুদ বা অন্য রঙেরও রাখা আছে কোথাও কোথাও। বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী তা নির্দিষ্ট রঙের ডাস্টবিনে ফেলার কথা। কিন্তু ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ কিংবা রক্তমাখা তুলা— সবই ফেলা হচ্ছে একই বিনে। আলাদা করার ব্যবস্থা নেই গজ, ব্যান্ডেজ, ওষুধের শিশি, ব্যবহূত স্যালাইন কিংবা রক্তের ব্যাগও। জীবাণুমুক্ত না করেই কঠিন এসব চিকিৎসা বর্জ্য চলে যাচ্ছে সাধারণ বর্জ্যের ভাগাড়ে। আর পরিশোধন ছাড়াই নালা-নর্দমা হয়ে তরল বর্জ্য মিশছে নদীতে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ করুণ চিত্র শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নয়, হাতেগোনা কয়েকটি বাদে রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একই অবস্থা। তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার তো নেই-ই, নেই কঠিন বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও। পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার বালাই নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে এসব চিকিৎসা বর্জ্য বিষিয়ে তুলছে পরিবেশ। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করছে; জনস্বাস্থ্যের জন্য যা মারাত্মক ঝুঁকি।

কঠিন ও তরল দুই ভাগে ভাগ করা হয় চিকিৎসা বর্জ্যকে। কঠিন বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে— ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিউমার, ওষুধের শিশি, ব্যবহূত স্যালাইন ও রক্তের ব্যাগ। তরল বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে রোগীর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা করে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সাধারণ বর্জ্যের মতো হাসপাতালের বর্জ্যও ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পন্ন ৯২ শতাংশ বর্জ্যই এভাবে রাস্তার পাশের খোলা ডাস্টবিন, নর্দমা কিংবা সংলগ্ন নদীতে ফেলা হচ্ছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন কঠিন বর্জ্য উত্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৫০ টন আসছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে। আর এ বর্জ্যের মাত্র ৮ শতাংশ রয়েছে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েস্ট কনসার্নের গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০০৭ সালে সারা দেশে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পন্ন বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার টনের বেশি। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১৯ হাজার টন। ২০১৭ সাল নাগাদ উত্পন্ন বর্জ্যের পরিমাণ সাড়ে ২১ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে।

এখনই এসব বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে আগামীতে রোগ প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকির বিষয়টি সারা বিশ্বেই রয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তরল চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব বর্জ্যের মধ্যে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক পানিবাহিত হয়ে মিশছে মাটি ও সংলগ্ন জলাধারে। এ অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের শস্য ও মাছে। এটি দুভাবে ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, প্রকৃতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এসব অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি অনেকগুলোকে আবার বেশি সহনশীল করে তুলছে। খাদ্যের মাধ্যমে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে মাছ ও শাক-সবজির মাধ্যমেও সরাসরি বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছে মানুষ। এসব অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার সহনশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর উত্পন্ন চিকিৎসা বর্জ্যে ৩০ থেকে এক হাজার গুণ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় যা অস্বাভাবিক।

চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ) বিধিমালায় চিকিৎসা বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণের জন্য পাত্র ও তার রঙ নির্দিষ্ট করে দেয়া রয়েছে। সাধারণ বর্জ্যের জন্য কালো, ক্ষতিকারক বর্জ্যের জন্য হলুদ ও ধারাল বর্জ্যের জন্য লাল রঙের পাত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া তরল বর্জ্যের জন্য ব্যবহার করতে হবে নীল, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের জন্য সিলভার ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ বর্জ্যের জন্য সবুজ রঙের পাত্র।

এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের সব হাসপাতালে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক। তবে দেশের মাত্র চারটি বেসরকারি হাসপাতালে ইটিপি রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো— বারডেম, অ্যাপোলো, স্কয়ার ও ইউনাইটেড।

এছাড়া পাত্রের গায়ে নির্দিষ্ট চিহ্ন ব্যবহারেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ প্রচার, নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগের অভাব ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। জীবাণুমুক্ত ও পরিশোধন না করেই যেখানে-সেখানে চিকিৎসা বর্জ্য ফেলছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। পরে তা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। বিস্তার ঘটাচ্ছে হেপাটাইটিস বি, সি, ডিপথেরিয়ার মতো বিভিন্ন রোগের।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের পাশাপাশি রোগীদের মধ্যেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পরিবেশ অধিদফতরকে এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ অধিদফতর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। এর মধ্যে স্কয়ারের কাছ থেকে ৩ লাখ, সেন্ট্রাল হসপিটালের ২ লাখ, পপুলার হাসপাতালের ৪ লাখ ও ড. সালাহউদ্দিন হাসপাতালের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে অধিদফতর। বাংলাদেশ মেডিকেলকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও পরবর্তী সময়ে আপিলের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা মওকুফ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর গ্রিন লাইফ হাসপাতালকে ২ লাখ ও জেডএইচ শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে অধিদফতর। তবে প্রতিষ্ঠান দুটি এ বিষয়ে আপিল করেছে, যা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ২৩৫টির বেশি। এছাড়া চালু রয়েছে আরো প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। এ ধরনের মোট ১৮ হাজার ক্লিনিক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি খাতে নিবন্ধিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে ৩ হাজার ৫১৬টি। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা প্যাথলজিক্যাল সেন্টার রয়েছে ছয় হাজারের বেশি। শুধু রাজধানীতে ১ হাজার ২০০টি নিবন্ধিত ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর বাইরে রাজধানীতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিবন্ধনহীন আরো পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ১৬ মে, ২০১৪ | নিউজ লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker