রাষ্ট্রীয় খাতের ডিজিটাইজেশন : বড় বিনিয়োগ সেবা অপূর্ণ

ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিক সেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করতে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোর একটি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)। তবে অধিকাংশ ইউনিয়নেই এখন পর্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে অদক্ষ উদ্যোক্তা, অচল যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট। অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় ও কেন্দ্রের বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের। এতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে ডিজিটাইজেশন উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রম ও নাগরিক সেবাপ্রাপ্তি আরো গতিশীল করতে বাস্তবায়ন হয়েছে ইউডিসির মতো বেশকিছু প্রকল্প। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প সেবাপ্রাপ্তি সহজ করলেও অনেক প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুফল পাচ্ছে না সাধারণ নাগরিক। উল্টো বড় ধরনের বিনিয়োগের কারণে সেবা গ্রহণে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়তে হচ্ছে তাদের। পুরোপুরি ডিজিটাইজেশন না হওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে।
গত এক দশকে বড় বিনিয়োগের সম্পন্ন, চলমান ও সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে স্মার্ট ন্যাশনাল আইডি, স্মার্ট গ্রিড, ডিজিটাল কানেক্টিভিটি, স্মার্ট সিটি, ন্যাশনাল আইটি ব্যাকবোন, এয়ারপোর্ট ডিজিটাইজেশন, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ডিজিটাইজেশন। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। বিপুল এ বিনিয়োগের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকেও অবস্থানের উন্নতি সেভাবে দৃশ্যমান নয়।
এক্ষেত্রে অনেক প্রকল্পে সমন্বয়ের অভাবের কথা উল্লেখ করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, এর ফলে একই স্কুলে হয়তো দুটি ল্যাব করা হয়েছে। আর অন্য আরেকটিতে দেয়াই হয়নি। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন এটি কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। এরই মধ্যে প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য সেবা ও অটোমেশনের বিষয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়েই চিহ্নিত করিয়েছি। এরপর সবগুলো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে সেবাগুলো নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কোনো প্রকল্পে দ্বৈততা রয়েছে কিনা তা-ও উঠে এসেছে। এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে মূল ধরে এটুআইকে কেন্দ্র হিসেবে নিয়ে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ সীমিত। এ সম্পদের ব্যবহার করতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে।
২০১১ সালের জুলাইয়ে জাতীয় পরিচয়ের স্মার্টকার্ড তৈরি ও হস্তান্তরের জন্য আইডিয়া নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নয় কোটি ভোটারকে এ পরিচয়পত্র দিতে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়। ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হলেও দরপত্র আহ্বানের বিলম্বে পিছিয়ে যায় তা। এরপর ফ্রান্সের ওবার্থুর নামের এক দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ করতে না পারায় পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। এ সময়ে আরো প্রায় এক কোটি ভোটার বেড়ে যাওয়ায় ২০১২ সালের পর ভোটার হিসেবে যুক্তদের স্মার্টকার্ডের পরিবর্তে কাগজে ছাপানো জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। দরপত্রে তৃতীয় হওয়া প্রতিষ্ঠানকে এ কাজ দেয়া হলে তারাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করতে পারেনি। শুধু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সম্পন্নের ব্যর্থতাই নয়, ভোটারদের দেয়া স্মার্টকার্ডে তথ্য ও মুদ্রণজনিত নানা ত্রুটিরও অভিযোগ রয়েছে।
গাড়ি চুরি বন্ধ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ২০১২ সালে মোটরযানে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন ডিভাইস (আরএফআইডি) ট্যাগ ও রেট্রো-রিফ্লেক্টিং (ডিজিটাল) নাম্বরা প্লেট সংযোজন কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে মোটরযানে রেট্রো-রিফ্লেক্টিং নাম্বার প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সংযোজন করা হয়। এরই মধ্যে যানবাহনের মালিকদের বড় একটি অংশকেই নিতে হয়েছে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট। এটি সংযোজনে যানবাহন ভেদে প্রত্যেককে গুনতে হয়েছে ২ হাজার ৭৪০ থেকে ৫ হাজার ৪০ টাকা। তবে গত পাঁচ বছরে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকের সুফল পাওয়ার তথ্য মেলেনি।
সেই সঙ্গে মেশিন রিডেবল ব্লু-বুক তৈরিসহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে ১২টি আরএফআইডি স্টেশন। এসব স্টেশন রয়েছে মহাখালী, গুলশান-২, কুড়িল বিশ্বরোড, গাবতলী, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, শাহবাগ, কাকরাইল, গুলিস্তান, বুড়িগঙ্গা সেতু-২ ও পোস্তগোলা সেতুতে। নতুন এ প্রযুক্তি কার্যকর করতে প্রতিটি গাড়িতে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি দেয়া হচ্ছে স্মার্ট রেজিস্ট্রেশন কার্ড বা ভেহিকলস ওনারশিপ কার্ড। গাড়ি নির্দিষ্ট এলাকা অতিক্রম করলেই তার তথ্য জমা হওয়ার কথা বিআরটিএর সার্ভারে, যার মাধ্যমে চুরি যাওয়া গাড়ির গতিপথ জানা যাবে। ফলে দ্রুতই ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ।
সীমিত আকারে স্থাপন করায় এসব স্টেশন কোনো কাজে আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এসব স্টেশন পেরিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট গাড়ি কিংবা গাড়িচালককে শনাক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। যদিও বিআরটিএ বলছে, বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রকল্পের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের জন্য বিনামূল্যে ১২টি আরএফআইডি স্টেশন দিয়েছে। এগুলোর সফলতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে সারা দেশে আরো ৩৫০টি আরএফআইডি স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আবার নাগরিকদের স্মার্ট এনআইডি, মোটরযান মালিকদের স্মার্ট রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও চালকের স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো আধুনিক পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে। এগুলোয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মোটরযানের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত থাকছে। পাশাপাশি এগুলোয় রয়েছে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য। এরই মধ্যে আধুনিক এসব পরিচয়পত্র নাগরিকদের হাতে পৌঁছে দেয়া হলেও এর কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। এগুলো শনাক্তকরণের কোনো ডিভাইস সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার না থাকায় সুফল মিলছে না। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে তাদের কার্যক্রম।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, বিশ্বে এখন কোন প্রযুক্তিটি চলছে কিংবা আগামী দিনে কোন প্রযুক্তি আসছে, তা যাচাই করার সক্ষমতার অভাব রয়েছে আমাদের। কোনো প্রকল্প আমাদের প্রয়োজন কিনা, তার সমীক্ষাও যথার্থভাবে হয় না। যে কারণে বাতিল হয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রযুক্তি বিক্রির জন্য আমাদের মতো দেশগুলোকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়া হয়। কারণ যারা এসব প্রকল্প নেন, তারাও জানেন না, দীর্ঘমেয়াদে কোন প্রকল্পটি আমাদের দরকার।
রাজস্ব আহরণের তিনটি খাতের মধ্যে শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটে ২০১৩ সালেই অটোমেশনের উদ্যোগ নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ওই বছর থেকেই শুল্ক স্টেশনগুলোয় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া শুরু করে সংস্থাটি। তবে হিসাব সংরক্ষণে নানামুখী জটিলতায় এখনো প্রায়ই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই পণ্য শুল্কায়ন করতে হয় ব্যবসায়ীদের। ভ্যাটের সব কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনতে ২০১৪ সালে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প নেয়া হলেও নতুন আইন বাস্তবায়ন না হওয়া ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। অন্যদিকে ২০১৫ সাল থেকে ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (ই-টিআইএন) প্রবর্তনের মাধ্যমে আয়করে অটোমেশন শুরু হলেও খুব একটা এগোয়নি প্রকল্পটি। আয়কর নিবন্ধন, রিটার্ন জমা দেয়া, কর পরিশোধসহ সব কার্যক্রম অনলাইনে হওয়ার কথা থাকলেও নিবন্ধন ছাড়া অন্য সবই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হয় করদাতাদের।
একইভাবে প্রতিটি জেলা শহরের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে জেলা তথ্য বাতায়ন নামে যে ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে না। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে এখনো প্রত্যাশিত মাত্রার সেবা পাওয়া সম্ভব হয়নি এগুলো থেকে।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি কমাতে অটোমেশনের (কোর ব্যাংকিং সলিউশন বা সিসিএস) ওপর জোর দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০১৬ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের সব শাখা শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনার শর্ত দেয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে এসব ব্যাংক তাদের এ শর্ত পরিপালন করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে তাদের সব শাখাকে শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
দ্রুত ডাটা আদান-প্রদানের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ন্যাশনাল আইটি ব্যাকবোন তৈরিতে নেয়া এসব প্রকল্পের বাইরেও রাষ্ট্রায়ত্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলা গভনেট ও ইনফো সরকার নামে দুটি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। বাংলা গভনেট প্রকল্পের মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার পাশাপাশি সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কে একটি পাবলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর ইনফো সরকার প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ১৮ হাজার সরকারি বিভিন্ন কার্যালয় যুক্ত হয়েছে একটি নেটওয়ার্কের আওতায়। বর্তমানে চলমান রয়েছে ইনফো সরকার-৩ প্রকল্প। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন বিডিরেন প্রকল্পের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। সমন্বয়হীন এমন বিনিয়োগকে সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
খাতটিকে যে ধরনের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, তাতে আরো বেশি উন্নয়ন প্রত্যাশিত ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও তা অনলাইনে পাওয়া যায় না। ব্যবস্থাপনা, ব্যবহারের দক্ষতা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল কনটেন্টের সহজলভ্যতা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবসহ আরো বেশকিছু কারণে সরকারি কার্যক্রমে নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত গতি পায়নি এখনো।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সম্প্রতি সমন্বয়হীনতাগুলো দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সাড়ে চার হাজার সেবা চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৭২৬টি ২০২১ সাল নাগাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের দ্বৈততা পরিহারেও এটুআই কাজ করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আইসিটি খাতে মোট ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর মিলিয়ে খাতটিতে মোট ১২০টি উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের ৪৭টিতে এবার নতুন বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিজিটাইজেশনের সুবিধা দেয়া সম্ভব না হলেও বিভিন্ন প্রকল্পে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ভুয়া লাইসেন্স প্রতিরোধে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফায় নতুন করে ১৫ লাখ পার্সোনালাইজড ডুয়াল ইন্টারফেস পলিকার্বনেট ড্রাইভিং লাইসেন্স (ডিজিটাল স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স) দেয়ার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। পাঁচ বছর মেয়াদে এ ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহে ব্যয় ধরা হয় ৭৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আর প্রতিটি নতুন লাইসেন্স তৈরিতে ভ্যাট-এআইটিসহ আগের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প হিসেবে রাজধানীর ধানমন্ডি, আজিমপুর, গ্রিন রোড, লালমাটিয়া ও আসাদগেট এলাকায় স্মার্ট গ্রিড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এর মাধ্যমে গ্রাহক তার ব্যবহূত বিদ্যুতের হিসাব জানতে ও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিও সহজে ত্রুটি শনাক্তকরণ ও গ্রাহকের বিদ্যুৎ চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি বাস্তবায়নে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার অনুদান দেবে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এফডিএন)। তবে সারা দেশে স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণে ২-৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান তথ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় স্থাপন করা হচ্ছে টিয়ার-৪ ডাটা সেন্টার। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে এ ডাটা সেন্টার স্থাপনে ব্যয় হচ্ছে ১৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া চীনের জেডটিই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় প্রকল্পটি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সম্প্রতি প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাজে অগ্রগতি হলেও এখনো নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৪০ শতাংশের কম। ২০২০ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
২০২১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এজন্য গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণের ওপর। এর অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে ১৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পটি নেয়া হয়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বেকার জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চারটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ১২টি আইটি প্রতিষ্ঠানকে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর কার্যাদেশ দেয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। তবে কাজ শেষ না করেই ভুয়া ভাউচার ও তথ্য দিয়ে বিল তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে এ প্রকল্পে। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় ৩১৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ধরে দ্বিতীয় সংশোধনীর অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সংশোধনীতে প্রকল্পের সময়সীমা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সব এলাকায় দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এস্টাবলিশিং ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শীর্ষক প্রকল্প। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের অধীন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। গত ২৮ অক্টোবর চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের (সিআরআইজি) সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি করেছে আইসিটি অধিদপ্তর।
প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপ্তির সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে, যেগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পৃক্ত বলে জানান অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর তদারকি হয় না। এছাড়া প্রকল্পের শুরুতে সেটির বিজনেস মডেল নিয়েও ভাবা হয় না। এখন বিজনেস মডেল ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। ইউডিসিগুলোর বেশকিছু এরই মধ্যে ব্রডব্যান্ড সংযোগের আওতায় এসেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে সবক’টি সংযুক্ত হয়ে যাবে বলে আশা করছি। ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নিয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ৩১ অক্টোবর, ২০১৮ | নিউজ লিংক



