Tech

অফনেট-অননেট অভিন্ন ভয়েস কলরেট: গ্রাহক নয়, লাভবান অপারেটররা

সেলফোন অপারেটরদের  অননেট অফনেট ভয়েস কলে অভিন্ন ট্যারিফসীমা চালু করা হয় গত বছরের আগস্টে। উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের ব্যয় সাশ্রয় করা। যদিও ফল হয়েছে উল্টো। এটি চালুর পর থেকেই খরচ বেড়েছে গ্রাহকদের। অন্যদিকে ভয়েস কলের ন্যূনতম ট্যারিফ বাড়ানোয় আয় বেড়েছে সব সেলফোন অপারেটরের। আর অপারেটরদের আয় বৃদ্ধিতে রাজস্ব বেড়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনেরও (বিটিআরসি)।

অভিন্ন ট্যারিফসীমায় অননেট-অফনেটের বিভেদ দূর হলেও ন্যূনতম ট্যারিফ বাড়ানো হয় সেলফোন অপারেটরদের। বিদ্যমান বাজারের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিটিআরসি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ট্যারিফ ব্যবস্থা চালুর পর সবচেয়ে বেশি আয় বেড়েছে গ্রামীণফোনের, ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বেসরকারি অন্য দুই সেলফোন অপারেটরের মধ্যে রবি আজিয়াটার আয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৫১ ও বাংলালিংকের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আয় বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র সেলফোন অপারেটর টেলিটকেরও, ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। নতুন ট্যারিফ ব্যবস্থা চালুর পর অননেট ও অফনেট মিলিয়ে গ্রামীণফোনের মাসিক গড় আয় বেড়েছে ৭১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর রবির ক্ষেত্রে এটি মাসিক ২৩ কোটি ৪০ লাখ, বাংলালিংকের ৭ কোটি ৭ লাখ ও টেলিটকের ২ কোটি ৬ লাখ টাকা।

অভিন্ন কলরেটে অপারেটরদের আয় বাড়লেও বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগ বেড়েছে গ্রাহকদের। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রাহকের সুবিধা বিবেচনায় নিয়েই অভিন্ন কলরেট চালু করা হয়েছে। অপারেটর পরিবর্তনের স্বাধীনতায় চালু করা এমএনপির জন্যও এটি প্রয়োজন ছিল। কোনো কোনো গ্রাহকের কাছে কলরেট বেড়েছে বলে মনে হতে পারে। তারা মূলত একাধিক সিম ব্যবহার করে এ সুবিধা পেতেন। তবে এটি কোনো আদর্শ ব্যবস্থা নয়। নতুন কল ট্যারিফের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেই।

অভিন্ন ট্যারিফ হারে ভয়েস কলরেটের সীমা নির্ধারণ করা হয় সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা ও সর্বোচ্চ ২ টাকা। এটি আগে ছিল ২৫ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত। তবে অন্য অপারেটরে কল করার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কলরেট ছিল মিনিটপ্রতি ৬০ পয়সা। এছাড়া নতুন কাঠামো অনুযায়ী আন্তঃসংযোগ চার্জ নির্ধারণ করা হয় ১৪ পয়সা, যা আগে ছিল ২২ পয়সা।

নতুন ট্যারিফসীমা চালুর পর অননেট (নিজস্ব নেটওয়ার্ক) কলে গ্রামীণফোনের প্রতি মিনিট কলরেট দাঁড়ায় গড়ে ৬৭ দশমিক ৮ পয়সা, রবির ৫৭, বাংলালিংকের ৪৯ ও টেলিটকের ৬৫ পয়সা। আর অফনেটে (অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক) কলরেট দাঁড়ায় গ্রামীণফোনের গড়ে ৬৮ পয়সা, রবির ৫৭ দশমিক ২, বাংলালিংকের ৫৪ ও টেলিটকের ৬৭ পয়সা। অননেট ও অফনেট দুই ধরনের ভয়েস কলেই গ্রামীণফোনের মার্কেট শেয়ার বেড়েছে।

নতুন ট্যারিফসীমা নির্ধারণের সময় যুক্তি হিসেবে বিটিআরসি বলেছিল, এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ হয়েছে। মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সেবা চালুর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এটির প্রয়োজন। এতে ছোট-বড় সব অপারেটর সমান সুবিধা পাবে। এখন সেবার মান দিয়ে বিদ্যমান গ্রাহক ধরে রাখা কিংবা নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করতে হবে তাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, অভিন্ন কলরেট চালুর ফলে গ্রাহকরা সব অপারেটরে একই খরচে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে অনেক গ্রাহকের অফনেট ভয়েস কলিংয়ের গড় খরচ আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে। আমরা মনে করি, এ ব্যবস্থা চালু করার ফলে সার্বিকভাবে গ্রাহকরা একাধিক কলরেটের ঝামেলা এড়িয়ে স্বাধীনভাবে সব অপারেটরে কথা বলতে পারছেন। এতে গ্রাহকদের একাধিক সিম ব্যবহারও যথেষ্ট কমে এসেছে। এছাড়া এ ব্যবস্থা চালুর আগে আমাদের নেটওয়ার্কে অননেট ও অফনেট কলের অনুপাত ছিল ৭০ঃ৩০, বর্তমানে যা ৫০ঃ৫০-এ দাঁড়িয়েছে।

গ্রাহকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলালিংক সবসময়ই তার গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা প্রদানে সচেষ্ট রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইউনিফায়েড কলরেটের কারণে অননেটে আমাদের ট্যারিফ কিছুটা বাড়লেও অফনেটে আমাদের ট্যারিফ অনেকটা কমে আসে, যা গ্রাহকদের খরচ স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কমিয়ে দেয়। এতে সার্বিকভাবে গ্রাহকরা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন বলে আমরা মনে করি। বিগত কয়েক মাসে বিটিআরসি প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোয় প্রতিফলিত হয়েছে, গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে বাংলালিংকের মার্কেট শেয়ার দ্রুত হারে বাড়ছে। সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা প্রদানের কারণেই আমাদের গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

অপারেটরদের কলপ্রতি ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে ২০১৫ সালে অফনেট কলরেট কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। ওই সময় তাতে অনুমোদন দেয়নি মন্ত্রণালয়। গত বছরের আগস্টে আবারো সেলফোন অপারেটরদের ভয়েস কল ট্যারিফসীমা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করে বিটিআরসি। এটি সংশোধন করে বর্তমান হারে প্রস্তাব করলে মন্ত্রণালয় তাতে অনুমোদন দেয়।

এর আগে ২০১০ সালের মার্চে ‘কস্ট মডেলিং, ইন্টারকানেকশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যান্ড ট্যারিফ পলিসি’ শীর্ষক প্রকল্প চালু করে বিটিআরসি। এতে সহায়তা দিচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)। এ প্রকল্পের আওতায়ই সেলফোন অপারেটরদের কল ট্যারিফসীমা ২৫ পয়সা থেকে ২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, গ্রাহকসংখ্যা ও আয়ের ভিত্তিতে সেলফোন সেবা খাতের নিয়ন্ত্রণ মূলত তিন অপারেটর গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবির নিয়ন্ত্রণে। বিটিআরসির সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে দেশে সেলফোন সংযোগসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের সংযোগ ৭ কোটি ৪৫ লাখ, রবির ৪ কোটি ৭৬ লাখ ও বাংলালিংকের ৩ কোটি ৪৫ লাখ। আর রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটকের সংযোগসংখ্যা ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার। গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে গ্রামীণফোনের মার্কেট শেয়ার ৪৬ দশমিক ৩৭, রবির ২৯ দশমিক ৬২, বাংলালিংকের ২১ দশমিক ৫১ ও টেলিটকের ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত | জুলাই ২০, ২০১৯ | নিউজ লিংক

Related Articles

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker