টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করা রাজস্ব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রেখে আসছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ আমানত ফেরত নিচ্ছে কমিশন। আমানত ফেরত চেয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে বিটিআরসি। ফেরত নেয়া আমানত সরকারের সংযুক্ত তহবিলে জমা করবে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রাখা ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা নগদায়নের জন্য গত সোমবার বেসরকারি যমুনা ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। চিঠিতে আজকের মধ্যে স্থায়ী আমানতটি নগদায়নের জন্য বলা হয়েছে। যদিও এটি মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ রয়েছে ২৬ জুন।
বিটিআরসির পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) আশীষ কুমার কুণ্ডু স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আপনার ব্যাংকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার একটি স্থায়ী আমানত করা হয়, যার মেয়াদ ২৬ জুন উত্তীর্ণ হবে। কিন্তু সরকার কর্তৃক জরুরি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অনিবার্য কারণবশত স্থায়ী আমানতটির সুদসহ সমুদয় অর্থ ১২ জুন টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের অনুকূলে পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা প্রদানের জন্য বলা হলো, যা প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে জমা দেয়া হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের ৯০টি শাখায় প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ১৩০টি স্থায়ী আমানত আছে। এসব আমানতও নগদায়ন করে পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিটিআরসির অনুকূলে জমা প্রদানের জন্য একই রকম চিঠি দিয়েছে কমিশন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেন, সরকার যেকোনো সময় এ অর্থ চাইতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের পক্ষে তা চেয়ে পাঠিয়েছে। এমনিতে বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক বা অন্য উৎস থেকে ঋণ করতে হচ্ছে সরকারের। এর চেয়ে বরং সরকারের নিজস্ব এ অর্থ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত ভালো হয়েছে। তবে ২৭ তারিখের পর এটি করা হলে স্থায়ী আমানতের মেয়াদপূর্তি হতো। আর তাতে সুদ বাবদ আয়ও পাওয়া যেত। তা না হওয়ায় সরকারের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। লাভ হয়েছে ব্যাংকগুলোর। কেননা শর্ত অনুযায়ী মেয়াদ পূর্তির আগে অর্থ ফেরত দিতে হলে কোনো সুবিধা দেবে না তারা।
এছাড়া আমানত প্রদানের অনুমোদন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে তুলনামূলক কম সুদহারের ব্যাংক বা ব্যাংক শাখাকে অনুমোদন দেয়ারও। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতিও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছে। এ নিয়ে এর আগে অর্থ সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিবের। এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে করবহির্ভূত রাজস্বপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়। গত ৩১ মার্চ চিঠি দিয়ে বিটিআরসিকে এ বিষয়ে জানায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে করা এফডিআর তুলে নিয়ে প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে জমা প্রদানের কাজ শুরু করেছে বিটিআরসি।
এনআরবি ব্যাংকের এমডি মেহমুদ হোসেন বলেন, এনআরবি ব্যাংকে বিটিআরসির যে অর্থ রয়েছে, তা নিয়ে গেলে খুব বেশি সমস্যা হবে না। তবে সব ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়া হলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তারল্য পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। জুন শেষে সরকারি পেমেন্ট আসবে। এজন্য ব্যাংক কিছু তারল্য পাবে।
তবে বিটিআরসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত এভাবে তুলে নেয়া হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি সৈয়দ হাবিব হাসনাত। তিনি বলেন, আমাদের বেশ কয়েকটি শাখায় বিটিআরসির অর্থ রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে টাকার অংক কত, তা না দেখে বলতে পারছি না। বিটিআরসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত এভাবে তুলে নেয়া হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয় ভাগাভাগির অংশ, লাইসেন্স নবায়ন, তরঙ্গ বরাদ্দ ফিসহ অন্যান্য উৎস থেকে সরকারের পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহ করে বিটিআরসি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানতের লভ্যাংশও বিটিআরসির আয়ের অন্যতম উৎস। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ২১-এর ২ অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকে কমিশনের অর্থ জমা রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কমিশন প্রতি ছয় মাসের সব ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত অর্থ প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে জমা প্রদান করবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ১২ জুন ২০১৯ | নিউজ লিংক



