বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড: রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দের অভাবে ঝুঁকিতে ৮০০ প্রকল্প

মাপ্ত আট শতাধিক প্রকল্পের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) প্রতি বছর প্রয়োজন পড়ে দেড় হাজার কোটি টাকা। এসবের বাইরেও বাপাউবোর জরুরি প্রয়োজনে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্প রয়েছে। অথচ এ চাহিদার বিপরীতে চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) সংস্থাটিকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩৭২ কোটি টাকা। সর্বশেষ তিন বছর ধরেই প্রায় একই পরিমাণ বরাদ্দ পাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বরাদ্দ না থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়ছে প্রকল্পগুলো। অন্যদিকে বাপাউবোর বকেয়াও বাড়ছে প্রতি বছরই।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে আপত্কালীন ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়েছিল পাউবো। এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৩৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা চাহিদার মাত্র ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। অথচ জরুরি প্রয়োজনে বাস্তবায়িত ও বাস্তবায়নাধীন কাজের জন্য এ পর্যন্ত বাপাউবোর শুধু বকেয়া বিলই রয়েছে ৫১০ কোটি টাকা। এ বিল পরিশোধের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, সেচ, হাওড় এবং সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণ কাজসহ নদীভাঙন রোধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদে চলতি বছর মন্ত্রণালয়ের কাছে বাজেটের অতিরিক্ত ৪৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুরোধ জানায় বাপাউবো।
এ প্রসঙ্গে বাপাউবোর মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, অর্থ যা বরাদ্দ দেয়া হয়, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে এসব প্রকল্পের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক কাজেরও চাহিদা থাকে। অনেক সময় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এসব কাজে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ থেকে ব্যয় করতে হয়। অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দের কারণে বর্তমানে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বাবদও বকেয়া বাড়ছে।
জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের জন্য সারা দেশে নয়টি জোনের আওতায় বাপাউবোর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এগুলো হলো— কেন্দ্রীয় অঞ্চল, পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত। এছাড়া অন্য আটটি জোনের কার্যালয় রয়েছে কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশালে।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ ৩৭২ কোটি টাকার মধ্যে আপত্কালীন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ কোটি টাকা। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যয়ের জন্য আপত্কালীন হিসেবে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতি বছরই এ ধরনের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সারা দেশে দুর্যোগ-পরবর্তী অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব পালন করে বাপাউবো। অথচ আপত্কালীন এসব কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য সংস্থাটিকে দেয়া বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চলতি অর্থবছরে বাপাউবোর বিভিন্ন প্রকল্প মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৪৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, পূর্বাঞ্চলে ১৫ কোটি ৪৮ লাখ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২১ কোটি ৬১ লাখ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ, পশ্চিমাঞ্চলে ২৪ কোটি ১২ লাখ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২৩ কোটি ৪৫ লাখ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৩৯ কোটি, উত্তরাঞ্চলে ৩৭ কোটি ৭০ লাখ ও দক্ষিণাঞ্চলে ৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে গত দেড় যুগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চাহিদার তুলনায় সংস্থাটিকে দেয়া বরাদ্দের পরিমাণ কমেই হ্রাস পেয়েছে। ২০০২-০৩ অর্থবছর ২৩৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা চাহিদার বিপরীতে বাপাউবোর বরাদ্দ ছিল ৮২ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা ৩৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পরবর্তী কয়েক বছরে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর ৪০০ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২৮১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। সংস্থাটিকে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয় ২০০৯-১০ অর্থবছরে। ওই বছর সংস্থাটিকে ৪০১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর পর থেকে বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমেই কমতে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর সংস্থাটি বরাদ্দ পায় ৩৭১ কোটি টাকা। পরের বছর বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ সর্বশেষ তিন বছর সংস্থাটির চাহিদা ছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, অপ্রতুল বরাদ্দ থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ এগিয়ে নিতে পাওয়া অর্থ প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে বিল বাকি রেখেই ঠিকাদারদের দিয়ে অনেক সময় কাজ করিয়ে নিতে হয়। এভাবে বকেয়া রাখায় এ পর্যন্ত পাউবোর কাছে ঠিকাদারদের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি টাকা।
জানা গেছে, গত বছরের মে মাসে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চায় বাপাউবো। এছাড়া গত বছরের বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ১৬টি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে আরো ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে আবেদন করে সংস্থাটি। তবে এ অর্থ বরাদ্দ পায়নি বাপাউবো।
শুধু মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজই নয়, প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে বাপাউবোর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতিও হচ্ছে ঢিমেতালে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ বরাদ্দ না থাকায় বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর ভাঙনরোধে গৃহীত প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে। সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশার কর্নিবাড়ী এলাকায় বিকল্প বাঁধ নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণ করতে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। প্রকল্পটির নাম দেয়া হয় কর্নিবাড়ী বিকল্প বাঁধ নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণ। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০১ কোটি টাকা। কিন্তু এই প্রকল্পের বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে পাউবো। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পেলে প্রকল্পটির কাজ সময়মতো শেষ নাও হতে পারে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত | ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ | নিউজ লিংক



